শেরশাহ মাত্র পাঁচ বছর রাজত্ব করেছিলেন। কিন্তু এই সর্বকালের মধ্যে সামরিক প্রতিভা ও শাসনতান্ত্রিক প্রতি সমন্বয়ে তিনি যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত থেকেও নবস্থাপিত সাম্রাজ্যের শান্তি রক্ষা ও সুশাসনের উৎকৃষ্ট ব্যবস্থার প্রবর্তন করে ভারতবর্ষের শাসনতান্ত্রিক বিবর্তনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। শেরশাহ প্রবর্তিত সকল সংস্কারই যে তার দ্বারা প্রথম উদ্ভাবিত তা কিন্তু নয়। এর অধিকাংশ পূর্ববর্তী যুগে কমবেশি বর্তমান ছিল। শেরশাহ এগুলি সময়োচিত পরিবর্তন ও সংস্কার করে নতুন ভাবে প্রবর্তন করেন। আবার কিছু সংস্কারের উদ্ভাবক শেরশাহ স্বয়ং প্রকৃতপক্ষে এইসব সংস্কার সমূহ পুরনো ও নতুন ভারতের মধ্যে সংযোগসূত্রের কাজ করেছে।
আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে শেরশাহের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এই যে তিনি যেহেতু নিজের জায়গীরদার ছিলেন সেহেতু অভিজ্ঞতার দ্বারা কৃষকদের মূল অসুবিধা গুলিও বুঝেছিলেন। তিনি সেই অসুবিধা গুলি দূর করেন। শেরশাহ কৃষককে তার সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধির প্রধান উপাদান বলে মনে করতেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি এই শব্দের জমির পরিমাণ ও স্বত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন যাতে তাদের বেআইনিভাবে উচ্ছেদ করা না যায় এবং যাতে নিয়মিত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়। মোটামুটি ভাবে বলা যায় যে, শের শাহ ভূমির রাজস্ব ব্যাপারে আধুনিক মনোবৃদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন -- রাষ্ট্রের প্রয়োজন ও স্বার্থ সম্বন্ধে অবস্থিত থেকেও প্রজা কল্যাণের বিষয়ে স্বাগত ছিলেন।
ভূমি রাজস্ব সংস্কারের পরে মুদ্রা ও শুল্ক সংস্কার শেরশাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান। শেরশাহ মুদ্রা নীতি ও শুল্কবিধির সংস্কার করেন। তিনি সোনা, রুপো ও তামার পৃথক পৃথক মুদ্রা চালু করেন। তার বিভিন্ন প্রকার স্বর্ণ মুদ্রার ওজন ছিল ১৬৮.৫ গ্রেন, ১৬৭ গ্রেন এবং ১৬৬.৪ গ্রেন। তার বিভিন্ন প্রকার রুপোর, মুদ্রার ওজন ছিল ১৮০ গ্রেন এবং ১৭৫ গ্ৰ গ্রেন। তার এই মুদ্রা নীতির সংস্কারের ফলে সাধারণত মানুষের ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে লেনদেনের অসুবিধা দূর হয়। শেরশাহের মুদ্রা সংস্কারের কাজে এতটাই দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন যে মুঘল ও ব্রিটিশ যুগের শেষ পর্যন্ত তার নীতি অবিকৃত অবস্থায় বলবৎ ছিলেন।
মুদ্রা ব্যবস্থা সংস্কারের ফলে বাণিজ্যে উন্নতি হয় এবং বণিকদের অযথা হয়রানির হাত থেকে রেহায় দেওয়ার জন্য তিনি বাণিজ্যিক আইন কানুন গুলি সহজ করে দেন। তিনি বাণিজ্য দ্রব্যের ওপর বিভিন্ন স্থানীয় অভ্যন্তরীণ শুল্ক আদায়ে রীতি তুলে দিয়ে কেবলমাত্র সীমান্তে অথবা বিক্রয়ের স্থলে উক্ত শুল্ক আদায়ের বন্দোবস্ত করেন। এতে ব্যবসা বাণিজ্যের যথেষ্ট সুবিধা হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থের কথা ভেবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সমগ্র দেশে কয়েকটি সুদীর্ঘ রাজপথ নির্মাণ করেন। প্রাচীন ভারতবর্ষের আদর্শ অনুযায়ী পথের দু'ধারে তিনি বৃক্ষরোপণ ও সরাইখানা স্থাপন করেছিলেন।
তিনি প্রায় ১৭০০টি সরাইখানা নির্মাণ করেছিলেন এই সরাইখানা গুলির ডাক চৌকির কাজও করত অর্থাৎ এগুলি চিঠিপত্র দেওয়া নেওয়া কেন্দ্র ছিল এবং আঞ্চলিক থানার কাজ করতো। এই দপ্তর গুলি যাদের হাতে ছিল তাদের "দারোগা-ই-ডাক -চৌকি" বলা হতো। সরাইখানা গুলি পথিকের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সরাইখানা গুলি প্রকৃতপক্ষে শেরশাহের সাম্রাজ্যের শিরা উপশিরার কাজ করতো।
শুধুমাত্র রাস্তা নির্মাণ নয়, লোকে যাতে নির্বিঘ্নে যাতায়াত ও ব্যবসা করতে পারে তার জন্য তিনি উপযুক্ত শান্তি শৃঙ্খলার ব্যবস্থা করেছিলেন। শেরশাহের গুপ্তচর বিভাগ খুবই তৎপর ছিল। শেরশাহের শাসনব্যবস্থার ফলে দেশের যে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত ছিল তার সামরিক সব তথ্য থেকে সমর্থিত হয়েছে। এমনকি ন্যায়বিচার প্রবর্তনীয় শেরশাহের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল।
শেরশাহের শাসনব্যবস্থা পর্যালোচনা করে অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক তার মৌলিকত্ব অস্বীকার করলেও, তিনি মধ্যযুগে ভারত ইতিহাসে একজন কঠোর পরিশ্রমিক দক্ষ প্রশাসক হিসেবে পুরাতন ভেঙে যাওয়া মুমূর্ষু শাসন ব্যবস্থাকে যেভাবে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং নতুন শক্তি প্রয়োগ করে পরিচালনা করেন, তার জন্য তাকে একজন মহান যোগ্য শাসক হিসেবে মেনে নিতে সকলেই একমত বস্তুত আকবরের পূর্বে কেউই শেরশাহ ছাড়া প্রজা কল্যাণমূলক প্রশাসনিক মনোভাবের পরিচয় দিতে পারেননি।
............ সমাপ্তি...........
✍️লেখিকা পরিচিতি
📖তথ্যসূত্র
- Poonam Dalal Dahiya, "Ancient and Medieval India".
- Upinder Singh, "A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century".
📖সম্পর্কিত বিষয়
- আলাউদ্দিন খলজির অর্থনৈতিক সংস্কার (আরো পড়ুন)।
- দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রকে কি ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র বলা যায় (আরো পড়ুন)।
- মুঘল আমলে বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা (আরো পড়ুন)।
- মুঘল আমলে সেচ ব্যবস্থা (আরো পড়ুন)।
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো। আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন।
------------🙏---------------